মাশরুম

কয়েক হাজার মিলিয়ন বছর আগে পৃথিবীতে জন্ম নেওয়া ব্যাঙের ছাতা বা মাশরুমকে নিয়ে কিন্তু মিথের অভাব নেই। এমনও শোনা যায়, চাঁদের গ্রহণ কিংবা শিখার রসায়নে পৃথিবীতে জন্ম নেয় বৈচিত্র্যময় মাশরুম। মিথ যতই থাকুক, একটা ব্যাপারে ভোজন রসিকেরা একমত, মাশরুম জাতীয় ছত্রাক খেতে খুব মজা।

সব ছত্রাকই যে সুস্বাদু তা নয়। ছত্রাকের আসল আকর্ষণই হচ্ছে তার বৈচিত্র্য। কোনো ছত্রাক মানুষের জীবন বাঁচায় আবার কোনোটা সৃষ্টি করে বিষময় বিভ্রম। কোনো কোনো ছত্রাক ফাইভ স্টার হোটেলের ডিনারের মেন্যুতে অন্যতম আকর্ষণীয় পদ আবার কোনোটা সিদ্ধই হয় না!

আধুনিক মাশরুম কালচার পরিণত হয়েছে একটি লাভজনক ব্যবসায়। অবশ্য অনাদিকাল থেকেই প্রকৃতি উদারভাবে জন্ম দিয়েছে অসংখ্য মাশরুমের। এসব বন্য অথচ প্রায় বিশুদ্ধ মাশরুম সাধারণত জন্ম নেয় স্যাঁতসেঁতে জলময় জায়গায়।

গত দশকে খুব কম শস্যই মাশরুমের মতো সুপারসনিক দ্রুততায় বেড়েছে। বিশেষত পূর্ব ইউরোপ, জার্মানি, ফ্রান্স আর ইতালিতে মাশরুম চাষ বেড়েছে অবিশ্বাস্য হারে। এই দেশগুলোতে জন্ম নিয়েছে অসংখ্য ছোট-বড় পেশাদার নার্সারি। এদের কাজই হচ্ছে পরিকল্পিত মাশরুম চাষ। এদের মধ্যে প্রতিযোগিতাটাও হচ্ছে সোজা বাংলায় হাড্ডাহাড্ডি। আমাদের বাংলাদেশেও আজকাল বাণিজ্যিক ভিত্তিতে মাশরুমের চাষ হচ্ছে। স্যাঁতসেঁতে ভেজা আবহাওয়ায় জন্মালেও মাশরুমের প্রয়োজন একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ উষ্ণতা এবং আলো। যারা পেশাদার মাশরুম বিশেষজ্ঞ, তাদের বলা হয় মাইকোলজিস্ট। ইউরোপের অনেক জায়গায়ই এরা স্থানীয় ফার্মাসিস্টদের সঙ্গে একযোগে গবেষণা করছেন। তাদের কাজের অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে, বিষাক্ত ছত্রাক চিহ্নিত করা।

মাশরুম জিনিসটা আসলে কি সেটা একটু জেনে নেওয়া যাক। মাশরুম হচ্ছে একধরনের স্বল্পস্থায়ী কিন্তু জটিল ছত্রাকদেহের ফলবতী অংশ। অন্যসব পরিচিত সাধারণ ফলের মতো এটাও পাকে, তবে সময় নেয় যথারীতি অল্প। অন্যসব ছত্রাকের মতো এটাও অবশ্যই পরজীবী। নিজ প্রয়োজনে পুষ্টিরস টেনে নেয় অন্য জীবদের থেকে।

অণু আকৃতির অনেক ছত্রাকই আমাদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার প্রাথমিক উপাদান। এর মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হচ্ছে পেনিসিলিয়াম। বিখ্যাত অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন সৃষ্টিতে পেনিসিলিয়ামের প্রয়োজনীয়তা সর্বাধিক। এছাড়া মদ তৈরির সময় যখন চিনিকে অ্যালকোহলে পরিণত করতে হয় তখন এক ধরনের ক্ষুদ্র ছত্রাকই আসল কাজটা করে দেয়।

মাশরুম গোত্রের সবচাইতে অভিজাত শ্রেণীটির নাম পযধসঢ়রমহড়হ। সেই চতুর্দশ লুইয়ের আমল থেকে ফ্রান্সে এর ব্যাপক আবাদ হচ্ছে, কিন্তু জনপ্রিয়তা কমেনি এতটুকু। বিশেষজ্ঞরা চেষ্টা করছেন মাশরুমের আরও কিছু উন্নত প্রজাতি আবিষ্কার করতে। মাশরুমের কোনো প্রজাতি কিন্তু সব জায়গায় জন্মে না। এক্ষেত্রে অয়েস্টার মাশরুম একমাত্র ব্যতিক্রম। আজকাল সাফল্যের সঙ্গে এই সুস্বাদু মাশরুম পৃথিবীর অনেক জায়গায় চাষ করা হচ্ছে। সারা ইউরোপে বন্য মাশরুমের প্রজাতির সংখ্যা প্রায় ৫ হাজার। ধারণা করা হয়, এদের মধ্যে মাত্র ১ হাজার ২০০ প্রজাতি খাবার উপযোগী। অবশ্য এর মানে এটা নয় যে, বাকি আর সবই বিষাক্ত। আসলে এদের তুলে এনে কেটেকুটে খাওয়াটা খুব সহজসাধ্য কাজ নয়। যেমন ফিল্ড মাশরুম আর হর্স মাশরুম শুধুমাত্র ব্রিটিশরাই হজম করতে পারে।

না জেনে, না চিনে মাশরুম খাওয়টা ভীষণ বিপজ্জনক। কিছু মাশরুম দেখতে সুন্দর আর আকর্ষণীয় হলেও কিন্তু বিষাক্ত। মোরেলস পাফবলস প্রজাতি এর ভিতরে পড়ে। কিছু মাশরুম আবার দেখতে ভীতিকর তবে স্বাদ অপূর্ব, যেমন সেপস্, চ্যানট্যারেলস। মেদ নিয়ে যারা অতিরিক্ত মাথা ঘামান, তাদের জন্য সুসংবাদ হচ্ছে, প্রায় সব মাশরুমই ক্যালরি ফ্রি। এদের অনেকেই ভিটামিন সি আর উদ্ভিজ আমিষে সমৃদ্ধ। স্বাদ বাড়াবার জন্য অনেকেই এদের চুবিয়ে রাখেন অলিভ অয়েলে। দুধ সংযোগে সিদ্ধ অথবা ঝলসানো মাশরুম এক কথায় অসাধারণ।
মাশরুম মাশরুম Reviewed by রেজওয়ান on 1:02 PM Rating: 5

No comments:

Powered by Blogger.