Posts Subscribe to This BlogComments

Follow Us

Saturday, November 21, 2009

মেহগনি

উপকারী ভেষজ বৃক্ষ মেহগনি
আলহাজ্ব সৈয়দ আব্দুল মতিন
আমাদের দেশে ভেষজ কীটনাশক হিসেবে বেশ আগে থেকেই নিম, তুঁতে, নিসিন্দা, তামাক পাতার নির্যাস ব্যবহার হয়ে আসছে। পৃথিবীর সবচেয়ে উপকারী গাছ হিসেবে নিম এখন সবার কাছে পরিচিত। গবেষকরা প্রায় ২০০ বছর নিমের ওপর গবেষণা কাজ চালিয়ে আসছে। ফলে এ গাছটির প্রতিটি অংশেরই উপকারিতা সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা মতামত প্রকাশ করেছেন। অথচ একই পরিবারভুক্ত বৃৰ হয়েও মেহগনির গবেষণা তথ্য এখনো অপ্রতুল।



মেহগনি ১৭৯৫ সনে পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ থেকে প্রথম এ উপমহাদেশে আনা হয়। কলকাতার বোটানিকাল গার্ডেনে পরীৰামূলক এ বৃৰের আবাদ করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে এর সম্ভাব্যতা যাচাই করে উপমহাদেশের বিভিন্ন স্থানে এর চাষ সমপ্রসারণ করা হয়। পৃথিবীতে এ যাবত তিন প্রজাতির মেহগনি বৃৰ আছে বলে জানা গেছে। মূলত এটি শোভাবর্ধনকারী ও মূল্যবান কাঠ হিসেবে আমাদের কাছে পরিচিত হলেও এর রয়েছে নানা ভেষজ গুণাগুণ। মেহগনির রয়েছে নানা ওষুধি গুণাগুণ, ফসলের উপকারী পোকামাকড়ের ৰতি না করে বালাইনাশক হিসেবে এর রয়েছে বিশেষ কার্যকারিতা। মেহগনির ওপর গবেষণার কাহিনীটিও বেশ চমৎকার। পরের বছর অর্থাৎ ২০০০ সনে আমার কর্মস্থলের সোনাতুনিয়া গ্রামের দু’জন কৃষক তিতা জাতীয় খাবার খাওয়ার প্রতিযোগিতা নিয়ে তর্ক করতে থাকে। একজন অপরজনকে তিতা খাওয়ার ব্যাপারে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়। অপরজন সেটি গ্রহণ করলে মেহগনি ফল খেয়ে প্রমাণের জন্য সম্মত হয়। কচি মেহগনির ফলে ৩-৪টি কামড় দিয়ে চিবুনি দেয়ার পর চ্যালেঞ্জ গ্রহণকারী কোনো কথা বলতে পারার মতো ব্যবস্থা না থাকায় বেশ কিছুৰণ ঝিম মেরে পড়ে থাকেন ও চ্যালেঞ্জে হেরে যান।
একই বছর আমন মৌসুমে ধান ৰেতে আইপিএম পদ্ধতি প্রয়োগের অংশ হিসেবে ডাল পোতার কাজ শুর্ব করি এবং মেহগনি গাছের ডাল দিয়ে সেটি করতে থাকি। একদিন সোনাতুনিয়া আইপিএম প্রশিৰিত কৃষক আঃ গণি জানায়, আইপিএম পদ্ধতিতে ৰেতে ডাল পোতার জন্য মেহগনি ডাল ব্যবহার করলে ঐ ডালে কোনো পাখি বেশি সময় বসবে না। এ প্রসঙ্গে তিনি আরো জানান, মেহগনি গাছে কোনো পাখি বাসা বাঁধাতো দূরে থাক বেশিৰণ বসে বিশ্রামও নেয় না। বিষয়টির ওপর গুর্বত্ব দিয়ে বেশ কয়েকদিন পর্যবেৰণ করার পর দেখলাম তথ্যটি অনেকাংশে সঠিক। এমনকি মেহগনি গাছের পাতা পোকামাকড় দ্বারা আক্রান্ত হয় না। মূলত তখন থেকেই ভেষজ কীটনাশক হিসেবে মেহগনি ফলকে ব্যবহারের চিন্তাভাবনা শুর্ব করি।
আইপিএম প্রশিৰণে যাওয়ার আগে অবশ্য কৃষক দ্বারা বিভিন্ন ফসলে, তুঁতে বোর্দ মিকচার, বার্গান্ডি মিকচার, তামাক পাতার রস ব্যবহার করেছি। কিন্তু সেটি কেবল গুটি কয়েক কৃষক ও ট্রায়ালের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। ২০০০ সনে আমন মৌসুমে খুলনার দৌলতপুরের হর্টিকালচার সেন্টারে আইপিএম প্রশিৰণ কোর্সের কারিগরি সহায়তাদানকারী হিসেবে কাজ করার সময় মেহগনি ফল নিয়ে ব্যাপকভাবে চিন্তাভাবনা করতে থাকি। সেখান থেকে কর্মস্থলে ফিরে গিয়ে কৃষক আঃ গণিকে দিয়ে কিছু মেহগনি ফল সংগ্রহ করি।
পরের বছর অর্থাৎ ২০০১ সনে আমন মৌসুমে ধান ফসলে শত্র্ব পোকা দমনের জন্য মেহগনি ফল দ্বারা তৈরি নির্যাস প্রয়োগ করে সফল হই। বিষয়টি আমার কর্মরত এলাকার (সোনাতুনিয়া, ভরসাপুর, ফয়লাহাট, গোবিন্দপুর) আইপিএম প্রশিৰিত কৃষকদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহের সৃষ্টি করে। বিগত ২০০২ সনে ভরসাপুর আইপিএম ক্লাবের সদস্যদের সহযোগিতায় ভেষজ কীটনাশক হিসেবে নিমের চারা রোপণের পাশাপাশি মেহগনি ফলের নির্যাস ব্যবহার করে আমন ও বোরো ফসলে পোকা দমনের কর্মসূচি গ্রহণ করি। পাশাপাশি একই বছরে রবি মৌসুমে সবজি ফসলে মেহগনির নির্যাস ব্যবহারের কর্মসূচিও গ্রহণ করি। আমন, বোরো ও শীতকালীন সবজি মৌসুমে কর্মসূচি সফলভাবে শেষ হয়েছে। ২০০৭ সনের বোরো মৌসুমে ৩ হেক্টর জমিতে মেহগনি ফলের নির্যাস ব্যবহার করে পোকামাকড়ের হাত থেকে ফসলকে রৰা করতে সৰম হই। নিম্নের সারণিতে পোকামাকড় দমনে মেহগনি ফলের নির্যাস ব্যবহারের ফলাফল দেখানো হলো।
সারণি-১ : ধান ফসলে পোকামাকড় দমনে পর্যবেৰণ (২০০৭)
কতবার সেপ্র করা হয় ১২-১৫ দিন পরপর ভেষজ নির্যাস তৈরির উপাদান কতটুকু জমিতে ব্যবহারের জন্য পর্যবেৰণ(২০ বার সুইপিংনেট)) কীটনাশক ব্যবহারের পূর্বে বন্ধু শত্র্ব পোকা পোকা কীটনাশক ব্যবহারের পরে (৩ দিন পর) বন্ধু পোকা শত্র্ব শত্র্ব পোকা প্রথম বার ২.৫ কেজি ফল (গুঁড়া থেঁতলানো লিটারv পানি) শতাংশ জমির জন্য (গাছ পাতা ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে ২২ ৫ ৩৫ ৩ দ্বিতীয় বার ঐ ঐ ৮৮ ২২ ১০৫ ৪ তৃতীয় বারv ঐ ঐ ১২৫ ৫০ ১৩৩ ৬ চতুর্থ_বার ঐ ঐ ১২৩ ৩৪ ১২৮ ৫
• চাক্ষুষ পর্যবেৰণকালে বন্ধু পোকার উপস্থিতি শতকরা ৮০-৯০ ভাগ।
• বন্ধু পোকামাকড় : মাকড়সা, লেডিবার্ড বিটল, বোলতা, ক্যারাবিডবিটল, ড্যামসেল ফ্লাই, ড্রাগন, ফ্লাই, স্ট্যাফাইনিলিট ও অন্যান্য।
• শত্র্ব পোকামাকড় : মাজরা, পাতা মোড়োনো, সবুজ পাতা ফড়িং, ঘাস ফড়িং, সাদা পিঠ ফড়িং ও অন্যান্য।
সারণি-২ : ধান বীজ সংরৰণ ও গোলাজাতকরণে পোকা দমন পর্যবেৰণ উপকরণ গোলাজাতকরণে ভেষজ কীটনাশক মেহগনি পর্যবেৰণ কাল যে পোকার ওপর পর্যবেৰণ করা হয় ধান বীজ ৪০ কেজি, ১টিw বস্তা, ১টি পলিথিন ব্যাগ, সুতলি ২০০ গ্রাম শুকনা বীজ ৬/৭/ মাস ধানের কেরি পোকা ঐ ২০০ গ্রাম শুকনা বীজ ৬/৭/ মাস ধানের কেরি পোকা উপর্যুক্ত পর্যবেৰণে সন্তোষজনক ফলাফল পাওয়া যায়।
এখানে গবেষণালব্ধ ফলাফল হতে মেহগনি ফল থেকে সংগৃহীত নির্যাস ও তেল ভেষজ কীটনাশক হিসেবে ব্যবহার ও প্রয়োগ পদ্ধতি বর্ণনা করা হলো।
প্রথমত : ২ থেকে ২.৫ কেজি মেহগনি ফল কুচি কুচি করে কেটে থেঁতলিয়ে মাটির চাড়িতে ১০ লিটার পানিতে ভালোভাবে ভেজাতে হবে। ৩ থেকে ৪ দিন পর নির্যাসটি ব্যবহার উপযোগী হয়। নির্যাসটি কাপড়ে ছেঁকে অল্প পরিমাণ (৫০ গ্রাম) সাবান গোলা পানি অথবা ডিটারজেন্ট মিশিয়ে ছেঁকে নিয়ে ফসলের ৰেতে সেপ্র করতে হবে। ধান ফসলের জন্য মিশ্রণটি উপযোগী। ধান ফসলের শত্র্ব পোকা (মাজরা, পাতা মোড়ানো, বাদামি গাছ ফড়িং) দমনে নির্যাসটি কার্যকর ভূমিকা রাখে। এছাড়া সবজিতেও (বাঁধাকপি, ফুলকপি, ওলকপি, টমেটো, শিম, বরবটি) নির্যাসটি ব্যবহার করা যায়।দ্বিতীয় বার আবার ৫ লিটার পানিতে ভিজিয়ে ৩-৪ দিন পর আর একবার ছিটানো যায়। নির্যাসের উচ্ছিষ্ট অংশ/ছোবড়া ভেষজ জৈব সার হিসেবে ধান ও সবজি বীজতলায় ব্যবহার করলে চারা উৎপাদনে পোকামাকড় কম হয়।
দ্বিতীয়ত : মেহগনির আধাপাকা ফলের বীচি ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম পরিমাণ গুঁড়া করে বা থেঁতলিয়ে তার সাথে ৫০০ গ্রাম ফলের বাকল গুঁড়া বা পাতা নিয়ে ৫ লিটার পানিতে ভালোভাবে একটি মাটির হাঁড়িতে ৪০ থেকে ৪৫ মিনিট আগুনে জ্বাল দিতে হবে। জ্বালানোর সময় ৫ মিনিট পর ৫০ গ্রাম পরিমাণ কাপড় কাঁচা সাবান বা ডিটারজেন্ট, ১০ গ্রাম তুঁতে ও ৫ গ্রাম পরিমাণ সোহাগা মাটির হাঁড়ির মিশ্রণের ভেতর দিতে হবে। একটি কাঠের বা বাঁশের কাঠি দিয়ে মিশ্রণটি নাড়তে হবে। এভাবে নির্যাস তৈরি হলে ঠাণ্ডা করে নির্যাস ৫ গুণ পরিমাণ পানিতে মিশিয়ে ভালোভাবে ছেঁকে আক্রান্ত গাছের পাতায় সেপ্র করতে হবে এভাবে তৈরি নির্যাস ১-২ দিনের মধ্যে ব্যবহার করলে ভালো ফল পাওয়া যায় ও বেগুন ফসলের পোকা দমনে উপযোগী। জাব পোকা, পাতা ছিদ্রকারী পোকা দমন এবং ছত্রাক রোগ দমনে বিশেষ উপযোগী। তৃতীয়ত : ২০০-২৫০ গ্রাম বীজ নিয়ে খোসা ছাড়িয়ে ১ লিটার পানিতে ৩-৪ দিন ভিজিয়ে রেখে ছেঁকে নিয়ে আরো ৯ লিটার পানিতে মিশিয়ে নির্যাস তৈরি করে ১ চামচ জেট পাউডার মিশিয়ে ফসলের ৰেতে সেপ্র করা যায় (মাজরা, পাতা মোড়ানো ও বাদামি গাছ ফড়িং দমনে কার্যকর)।
গুদামজাত শস্যের জন্য : ২০০ গ্রাম মেহগনি ফলের বীচির গুঁড়া ১ মণ দানাজাতীয় শস্যের জন্য ব্যবহার করা যায় (রৌদ্রে ভালোভাবে বীচি শুকিয়ে গুঁড়া করতে হবে)। দানাজাতীয় শস্যের সাথে ভালোভাবে মিশিয়ে বায়ুশূন্য প্যাকেটে সংরৰণ করতে হবে।
১ কেজি বীজ থেকে খোসা ছাড়িয়ে ৬৫০-৭৫০ গ্রাম সাদা শাঁস বীজ পাওয়া যায়। সাদা শাঁস বীজ ৩১২ কেজি হতে হাতের সাহায্যে ৯০০ মিলি. থেকে ১০০ মিলি. মেহগনি তেল পাওয়া যায়। এক্সপেলারে ভাঙালে আরো বেশি পরিমাণে তেল পাওয়া যেতে পারে। তেল তৈরির পর অবশিষ্টাংশ খৈল রৌদ্রে ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ু শূন্য পলিব্যাগে সংরৰণ করা যেতে পারে। মেহগনি ফল জানুয়ারি, ফেব্র্বয়ারি মাসে পরিপক্ব হয়। বছরে গাছপ্রতি ৫০-৩০০ বা তার চেয়ে বেশি পরিপক্ব মেহগনি ফল পাওয়া যায়। প্রতিটি ফল ১৫০-৬০০ গ্রাম ওজনের হয়ে থাকে। ফলের মধ্যে ৩৫-৭০টি বীজ থাকে যার রঙ বাদামি। যদি সংরৰণ করতে হয় তবে পরিপক্ব বীজ হওয়া বাঞ্ছনীয়। তবে কাঁচা ফল থেকে নির্যাস পেতে হলে মাস থেকে ব্যবহার করা যাবে। মেহগনি ফলের বাকল শুকিয়ে গুঁড়া করে বায়ুশূন্য পাত্রে সংরৰণ করে অন্য মৌসুমে ব্যবহার করা যাবে। মনে রাখতে হবে ফল সংগ্রহ করে খোসা ও বীজ ভালোভাবে শুকিয়ে বায়ুশূন্য পাত্রে না সংরৰণ করলে ছত্রাক জমে যাবে। মাঝে মধ্যে রৌদ্রে শুকানো ভালো। কারণ ফল বীজ ও খোসা বায়ু থেকে আর্দ্রতা সংগ্রহের ৰমতা বেশি।
মেহগনি বীজের সাদা অংশ দিয়ে তেল তৈরি এবং ভেষজ কীটনাশক ও তার ব্যবহার
ধানের শত্র্ব পোকা দমনে ১০ লিটার পানিতে ৩০-৩৫ মিলি. ওষুধ ১ চামচ ডিটারজেন্ট/জেট পাউডার মিশিয়ে ধান ফসলের কুশি ও পাতা ভালো করে ভিজিয়ে দিতে হবে। ধান ফসলের জমিতে খৈল ও পাতার গুঁড়া প্রয়োগ করলে জমিতে উদ্ভিদের পুষ্টি উপাদান সংরৰণ করতে সাহায্য করে। এ ছাড়া মাটির ৰতিকারক পোকামাকড় ধ্বংস করে। ফসলের ফলনও বৃদ্ধি হয়। লবণাক্ততা অনেকাংশে কমে যায়।
আমের হপার বা শোষক পোকা : ১০ লিটার পানিতে ৪০ মিলি. ওষুধ এবং ১ চামচ ডিটারজেন্ট/জেট পাউডার মিশ্রণ করে পাতা, ডাল ও মুকুল ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে। বেগুনের ডগা ও ফলের মাজরা পোকা, কাঁঠালি পোকা, ঢেঁড়সের জ্যাসিড : ১০ লিটার পানিতে ৩০ থেকে ৩৫ মিলি ওষুধ এবং ১ চামচ ডিটারজেন্ট/জেট পাউডার মিশিয়ে ডগা, পাতার ওপরে ও নিচে ভালোভাবে ভিজিয়ে দিতে হবে।
এভাবে ধান, ফল ও সবজি চাষে রাসায়নিক কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশসম্মত ভেষজ কীটনাশক বাড়িয়ে চাষাবাদে দেশের কৃষক সমাজকে উৎসাহিত করতে পারলে আইপিএম’র উদ্দেশ্য সফল এবং মাটির উর্বরতা সংরৰণ সম্ভব হবে ও কৃষকের উৎপাদন খরচ কমানো যাবে বলে মনে করি। গুটি ইউরিয়া সার দেখতে চমৎকার কম খরচে ফলন বাড়ে নাই তুলনা তার কৃষিকথা/বৈশাখ, ১৪১৫ * উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা, উপজেলা কৃষি অফিস, রামপাল, বাগেরহাট

Related Post



0 comments:

Post a Comment

Bangla Help

Sponsor